শনিবার ১৮ নভেম্বর ২০১৭ || সময়- ৭:০৪ pm
রামপাল প্রসঙ্গ: এসিড রেইন, উপেক্ষিত জনস্বার্থ ও কার্বন ক্যাপচার

ইনফরমেশন ওয়াল্ড পরিবেশ নিউজ ডেক্স
চট্টগ্রাম:---                                                                 আঞ্জুমান ইসলাম ও কাজী আহমেদ পারভেজ

চারপর্বের ‘রামপাল অভিযোগনামা’ শেষ হওয়ার পর কিছু প্রশ্ন এসেছে আমাদের কাছে। কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আজকে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ বাকি তিনটি প্রশ্নের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করছি এবং সেই সঙ্গে এই লেখার মাধ্যমেই রামপাল প্রসঙ্গের আপাতত ইতি টানছি আমরা।

প্রশ্ন ১:

রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে যেসব আর্টিকেল বা ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রত্যেকটিতেই আশংকা করা হয়েছে যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে এসিড রেইন হবে। আসলেই কি তাই?

উত্তর ১:

এ ব্যাপারে আমরা একমত যে রামপালের নির্মিতব্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের কথা এলেই এসিড রেইনের ব্যাপারটা চলে আসে। যারা এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করছেন তারা তাদের প্রচারণায় এসিড রেইন ব্যাপারটিকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং নানান রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে রামপালে এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে এখানে এসিড রেইন হবে।

এ কারণে এসিড রেইন সম্পর্কে একটু বিস্তারিত জানানো জরুরি মনে করছি। সবার আগে জানা দরকার এসিড রেইন ব্যাপারটা আসলে কী।

আগেই বলে রাখি এসিড রেইন ব্যাপারটি এমন নয় যে দূষণের কারণে আকাশে এসিড তৈরি হবে আর তা বৃষ্টির মতো ঝরঝর করে পড়বে। এসিড রেইন হল বৃষ্টির পানির কোনো কারণে তুলনামূলকভাবে বেশি অ্যাসিডিক হয়ে যাওয়া।

আপনাদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসছে যে ‘তুলনামূলকভাবে বেশি’ কথাটি কেন ব্যবহার করছি, তাহলে কি বৃষ্টির পানি আসলে অ্যাসিডিক? উত্তর হল, ঠিক ধরেছেন। শুধু বৃষ্টির পানি নয়, পরিবেশে যে পানি আমরা দেখি তার সবই অ্যাসিডিক। কেন?

কারণ হল এক অণু অক্সিজেন আর দুই অণু হাইড্রোজেন মিলে যে পিওর পানি (H2O) তৈরি হয় তা নিউট্রাল হলেও তাতে বাতাসে থাকা কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) ও সালফার-ডাই-অক্সাইড (SO2) দ্রবীভূত হয়ে যায়। যদি কোনো রকম পরিবেশ দূষণ না-ও ঘটে, তবুও প্রাণি ও উদ্ভিদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও দেহাবশেষের পচন থেকে নির্গত CO2, বজ্রপাতের সময় বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন মিলে NO ও সেখান থেকে NO2, অগ্নুৎপাতের (ভলকানো) ফলে নির্গত SO2 ক্রমাগতভাবে বাতাসে জমা হচ্ছে।

এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তৈরি CO2, NOx ও SOx বৃষ্টির পানিতে দ্রবীভূত হয়। আর এ কারণে স্বাভাবিক বৃষ্টির পানি কিছুটা অ্যাসিডিক। প্রশ্ন আসতেই পারে কতটা অ্যাসিডিক? এ জন্যে আগে অ্যাসিডিটি প্রকাশের যে পদ্ধতি সে সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া দরকার।

অ্যাসিডিটি মাপা হয় পার হাইড্রোজেন বা pH দ্বারা যা আসলে কোনো একটি sample এ কত পরিমাণ পজিটিভলি চার্জড আয়ন আছে তারই একটি প্রকাশ। কোনো পদার্থের pH যদি ৭ হয় তাকে আমরা বলি নিউট্রাল। আর যেসব পদার্থের pH ৭ এর কম সেগুলোকে বলি অম্লীয় বা অ্যাসিডিক। অন্যদিকে যেসব পদার্থের pH ৭ এর বেশি, সেগুলোকে বলি ক্ষারকীয় বা বেসিক।

আসুন US EPA এর ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া একটি ছবি দেখি যা আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করবে পদার্থের এই pH স্কেলটি–

Image-1 (PH scale) 
pH স্কেল
সূত্র:

http://www.epa.gov/acidrain/measure/ph.html

উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে আমরা যে দুধ খাই তার pH ৬.৪ থেকে ৭.৬ এর মধ্যে থাকে। আপেলের pH ২.৯ থেকে ৩.৩ এর মতো। আর আমরা যে লেমোনেড বা অন্যান্য কার্বোনেটেড ড্রিঙ্কস (কোক, পেপসি ইত্যাদি) হরহামেশাই পান করি তার pH ২.২ থেকে ৩।

রেইন ওয়াটারের pH ৬-এর মতো থাকার কথা যদি তাতে শুধু ন্যাচারাল উপায়ে তৈরি CO2, SO2 ও NOx দ্রবীভূত হয়। আর বর্তমানে US EPA এ অনুযায়ী বৃষ্টির পানির pH যদি ৫.৩-এর নিচে নেমে যায় তাহলেই তাকে এসিড রেইন বলা হয়।

সুতরাং এমন নয় যে এসিড রেইন মানে আকাশ থেকে এসিড পড়ে সবকিছু গলে বা জ্বলে যাবে। pH ৫.৩ এর চেয়ে অনেক কম pH এর জিনিস, যেমন আপেল, লেমোনেড ইত্যাদি আমরা হরহামেশাই খাই।

যাহোক, এসিড রেইন ব্যাপারটা সবার দৃষ্টি কাড়ে যখন দেখা যায় যে আমেরিকাতে বৃষ্টির পানির pH দিন দিন কমছে। এ নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন ওঠে এবং নিচে দেখানো ১৯৯৬ সালের ম্যাপে দেখা যায় যে USA এর নিউ ইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস, পেনসিলভ্যানিয়া, ওহাইয়ো, ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ডসহ প্রায় পুরো পূর্বাংশের রেইন ওয়াটার pH ৪ থেকে ৫ এর মধ্যে; অর্থাৎ এই পুরো অংশটি এসিড রেইন দ্বারা আক্রান্ত। কোনো কোনো জায়গার বৃষ্টির পানির pH ৪ এরও নিচে। তারপরও অবশ্য এখানকার গাছপালা, ফসল, স্টিল স্ট্রাকচার মোটামুটি ভালোই টিকে গেছে; ফসল উৎপাদনও কমেছে বলে জানা যায়নি।

Image-2 (map of USA)

তবে এই বৃষ্টির পানির pH এর এই নিম্নধারা যেন অব্যাহত না থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৃষ্টির পানিকে যেন আবার স্বাভাবিক কাছাকাছি মাত্রার pH এ ফিরিয়ে আনা যায় সেজন্যে সেখানে বেশকিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল US EPA কর্তৃক আরোপিত ‘Clean Air Act’ যার আওতায় সমস্ত কলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হয় কঠোরভাবে emission limit মানতে এবং ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে SO2 এবং NO2 এর নিঃসরণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।

নিচের ছবিতে দেখুন ২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত থেকে উৎপন্ন টোটাল SO2 ও NOx নিঃসরণ দেখানো হয়েছে। যদিও আমেরিকাতে বিভিন্ন খাত, যেমন আয়রন ও স্টিল, যানবাহন ইত্যাদি সেক্টরে যে পরিমাণ কয়লা, গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম পোড়ানো হয় তাতে আসল SO2 ও NOx নিঃসরণের পরিমাণ নিচের চিত্রের চেয়ে প্রায় দশ গুণ বেশি।

Image-3 (Co2 So2)

তারপরও আলোচনার খাতিরে শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকে নিঃসরিত SO2 ও NOx কেই গোনায় নিচ্ছি। আগেই বলা হয়েছে (‘রামপাল: কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর’) স্বাভাবিক তাপ ও চাপে CO2 এর সলিউবিলিটি যা তাতে CO2 নিঃসরণ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় বৃষ্টির পানিকে অ্যাসিডিক করতে এবং নিচের ছবিতে দেখা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ খাত থেকে CO2 নিঃসরণে তেমন কোনো পরিবর্তনও আসেনি ২০০১ থেকে ২০১১ তে।

ডেটা: U.S. Energy Information Administration

http://www.eia.gov/electricity/annual/html/epa_09_01.html

তো এই SO2 ও NOx এর নিঃসরণে কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে এসিড রেইন সমস্যার কি কোনো পরিবর্তন হল সেখানে? আসলেও কি যুক্তরাষ্ট্রের বৃষ্টির পানিকে অ্যাসিডিক হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা গেল?

আসুন দেখি নিচের চিত্রটি যেখানে ২০০৬, ২০১০ ও ২০১১ এর বৃষ্টির পানির pH দেখানো হয়েছে।

Image-4 (rain water PH)

সূত্র: US National Atmospheric Data Program

http://nadp.sws.uiuc.edu/NTN/annualmapsbyyear.aspx

উপরে দেখানো চিত্র থেকে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, বর্তমানে US EPA (সেই সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক) যে নিঃসরণ মাত্রা নির্ধারণ করেছে তাতে বর্তমানের নিঃসরণজনিত কারণে বৃষ্টির পানির pH হ্রাস পাওয়ার যে ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছিল সেটা তো বটেই, বৃষ্টির পানির উপর পূর্ববর্তী উচ্চমাত্রার নিঃসরণের ফলে জমে যাওয়া SO2 ও NOx এর প্রভাবও কমানো সম্ভব হয়েছে।

২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দুয়েকটি জায়গা বাদে মোটামুটি সব জায়গাতেই বৃষ্টির পানির pH ৫ এর কাছাকাছি বা বেশিতে চলে এসেছে। (এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, ১৯৯৬ থেকে ২০১১ তে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কিন্তু বেড়েছে, যদিও পলিউশন কমেছে; বিস্তারিত দেখুন ‘রামপাল অভিযোগনামা’র তৃতীয় পর্বে।)

এখন আসুন ছোট্ট একটি অঙ্ক করি। রামপালে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রে থেকে নির্গত SO2 এবং NOx এর কারণে বাংলাদেশের বৃষ্টির পানি অ্যাসিডিক হয়ে যেতে পারে কি না সে বিষয়ে। যদিও EIA তে বলা হয়েছে যে SO2 এর নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে ফ্লু গ্যাস ডিসালফারাজেশান (FGD) ও NOx এর নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণের জন্যে Two stage burner বা low NOx burner রাখার জন্যে এবং সেটা মেনেই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হবে– তারপরও আসুন কিছুক্ষণের জন্যে ধরে নিই যে রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে আসলে কিছুই করা হবে না SOx এবং NOx নিয়ন্ত্রণে। সে ক্ষেত্রে আসলে বৃষ্টির পানির pH নেমে যাওয়ার কি সম্ভাবনা আছে?

২০১১ সালে (যখন কিনা যুক্তরাষ্ট্রে বৃষ্টির পানির অ্যাসিডিটি প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় চলে এসেছে) যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ খাত থেকে নিঃসরিত টোটাল SO2 ও NOx নিঃসরণ ছিল যথাক্রমে ৪৮,৪৫,০০০ ও ২৪,০৬,০০০ মেট্রিক টন। আমেরিকার আয়তন ৩৭,৯৪,০০০ বর্গমাইল। সে হিসেবে বিদ্যুৎ খাত থেকে নিঃসরিত SO2 ও NOx এর প্রভাব প্রতি বর্গমাইলে যথাক্রমে ১.২৮ ও ০.৬৩ মেট্রিক টন।

অন্যদিকে রামপালে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে (কোনো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই ধরে নিয়ে) SO2 ও NOx নিঃসরণ হওয়ার কথা যথাক্রমে (৭০ ও ৪২ টন প্রতিদিন হিসেবে ৩৬৫ দিনের জন্যে) ২৫,৫৫০ ও ১৫,৩৩০ মেট্রিক টন।

বাংলাদেশের আয়তন ৫৬,৯৭৭ বর্গমাইল। সে হিসেবে নিঃসরিত SO2 ও NOx এর প্রভাব প্রতি বর্গমাইলে যথাক্রমে ০.৪৫ ও ০.২৭ মেট্রিক টন। প্রতি বর্গমাইলে আনুপাতিক হিসাবে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ মাত্রার SO2 ও NOx ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিঃসরিত SO2 ও NOx এর যথাক্রমে মাত্র ৩৫% ও ৪২%।

এ থেকে এটি খুবই স্পষ্ট যে কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও যদি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত SO2 ও NOx নিঃসরণ হয় তবুও এসিড বৃষ্টি তো দূরের কথা, বৃষ্টির পানির pH ৫.৩ এর আশেপাশেও আসবে না।

এসিড রেইনজনিত কোনো সমস্যা একেবারেই না থাকার পরও SO2 o NOx নিঃসরণের নিয়ন্ত্রণে সকল প্রকার উদ্যোগই থাকবে রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। FGD এর মাধ্যমে ৯০% SO2 কে FGD জিপসাম হিসাবে সরিয়ে নেওয়া হবে, NOx যেন সর্বনিম্ন পরিমাণে উৎপন্ন হয় সেজন্যে ডাবল NOx বার্নার থাকবে।

তাই রামপালে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে এসিড রেইন হবে বলে যারা প্রচার করেছেন তারা হয় নিজেরাই প্রকৃত জ্ঞান রাখেন না অথবা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই আতংকটি ছড়িয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়।

প্রশ্ন ২-

২৪শে অক্টোবর ‘প্রথম আলো’তে প্রকাশিত “বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি” নামের একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। আপনারা ‘রামপাল অভিযোগনামা’র শেষ পর্বে এই নিবন্ধটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রশ্ন (ক) নিবন্ধটিতে যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, অর্থাৎ রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে– সে ব্যাপারে কী বলবেন? প্রশ্ন (খ) মূল যে HEAL আর্টিকেলের পরিপ্রেক্ষিতে এই “বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি” নিবন্ধটি লেখা সেই HEAL এর আর্টিকেলটিকেই বা কেন “প্রোপাগাণ্ডানির্ভর NGO-র বস্তাপচা ডেটা সম্বলিত” বলা হয়েছে?

“বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি” লেখাটি পাবেন এখানে–

http://www.prothom-alo.com/opinion/article/57385/%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B2_%E0%A6%93_%E0%A6%9C%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%9D%E0%A7%81%E0%A6%81%E0%A6%95%E0%A6%BF

HEAL এর মূল আর্টিকেল–

The unpaid health bill: How coal power plants make us sick পাবেন এখানে–

http://www.env-health.org/IMG/pdf/heal_report_the_unpaid_health_bill_how_coal_power_plants_make_us_sick_final.pdf

উত্তর ২ এর ‘ক’

প্রথমেই বলতে হয় যে, “বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি” নামের নিবন্ধটি বাস্তবতাবিবর্জিত একটি নিবন্ধ। কেননা এই নিবন্ধে রামপালে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কিনা, এই মর্মে হাস্যকরভাবে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল।

খুব গভীর কোনো তাত্ত্বিক আলাপে না গিয়েও ওই নিবন্ধের লেখকের আশংকা শুধু এই কথা বলেই খুব সহজেই উড়িয়ে দেওয়া যায় যে, জনস্বাস্থ্যের বিষয়টাতে যদি গুরুত্ব দেওয়া না-ই হত, তাহলে প্রকল্পটিকে রেড ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভূক্ত জ্ঞান করে একটি বাধ্যতামূলক ও নিবিড় পরিবেশ সমীক্ষা বা Environmental Impact Assessment (EIA) পরিচালনা করা হল কার স্বার্থে? জনস্বার্থেই তো।

আর লেখক কী করে ভাবলেন যে জনস্বাস্থ্য উপেক্ষা করে জনস্বার্থ অর্জন করা যায়? অবশ্য কথায় কথায় যারা ৩০-৪০ জন বিশেষজ্ঞের করা ৬৭২ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত (Detailed) EIA কে ছুঁড়ে ফেলে দেন, প্রত্যাখ্যান করেন, ‘লোকদেখানো’ বলে প্রচার করে বেড়ান; যাদের কাছে ১৪ পৃষ্ঠার ‘চোতাবাজি করা’ আন-রিভিউড, আন-অথেনটিক, আন-সার্কুলেটেড একটি পিডিএফ ফাইল হল উন্নতমানের ইনডিপেন্ডেন্ট EIA, তাদের কাছ থেকে এ রকম উদ্ভট আশংকা আসতেই পারে। আসাটা মোটেই বিচিত্র নয়।

যাহোক, শুরুতেই দেখে নিই EIA র স্কোপের মধ্যে স্বাস্থ্যের বিষয়টা কীভাবে অ্যাড্রেস করাটা জেনারেল প্র্যাকটিস বা প্রচলিত। সাধারণত দুই ধাপে স্বাস্থ্যের বিষয়টি EIA এর স্কোপের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে:

i) প্রকল্পের কারণে যে বিভিন্ন ধরনের ইমপ্যাক্ট হতে পারে, তার মধ্যে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত যেসব ইমপ্যাট ঘটতে পারে, অ্যাসেসমেন্ট পর্যায়ে তা অন্তর্ভুক্ত রাখা।

ii) অ্যাসেসমেন্টের সময় যে সকল স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ইমপ্যাক্ট চিহ্নিত করা হয়েছিল, মিটিগেশন প্ল্যানে সেসব অন্তর্ভুক্ত রাখা।

এখানে কিন্তু স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে EIA র স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত স্কোপের মধ্য ‘জন’ স্বাস্থ্যের ‘গোটা’ বিষয়টা আসার সুযোগই নেই। শুধু প্রকল্প-সম্পর্কিত ইমপ্যাক্টই অন্তর্ভুক্ত হবে EIA তে এবং সে সংক্রান্ত রিমেডিগুলো আমলে নেওয়া হবে। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে “বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি” নিবন্ধের লেখকের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই যে কোন প্রকল্পের EIA রিপোর্ট আসলে কী ও এটি কেন করা হয়।

“বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি” নিবন্ধের লেখক EIA র ২৭১, ৪০২, ২৯১ ইত্যাদি পৃষ্ঠা উল্লেখ করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করে বলেছেন যে, উনি পড়তে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছেন এবং সংশয় প্রকাশ করেছেন যে আসলেও কি যত্ন নিয়ে এই অংশটি লেখা হয়েছে কিনা।

সত্যি বলতে কী, উনি হোঁচট খেয়েছেন EIA ‘কী’ তা না জানার ও EIA এর ‘স্কোপ’ না বোঝার কারণে। যেমন EIA এর পৃষ্ঠা ২৭১-এ অ্যামবিয়ান্ট এয়ারে এ প্রকল্পের কী কী জিনিস ইমপ্যাক্ট রাখবে বা রাখতে পারে তা বর্ণনা করা আছে। যেহেতু সম্ভাব্য ইমপ্যাক্ট সৃষ্টিকারী ব্যাপারগুলোর প্রতিটিরই গ্রহণযোগ্য মান জানা আছে, উৎপন্ন ওই সকল সম্ভাব্য ক্ষতিকারক বস্তুসমূহ কী পরিমাণে বাতাসে থাকবে তার হিসেব করা আছে এবং এগুলো গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রাখতে কী কী করণীয় তাও পরবর্তীতে আলোচনা করা হয়েছে।

সুতরাং স্পস্টতই পুরো ব্যাপারটির ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করে রিপোর্ট করা হয়েছে। এখন কেউ যদি ২৭১ পৃষ্ঠা পড়ে ভাবে যে EIA তে এসব সমস্যার কথা লিখে দেওয়া আছে, তারপরও কেন প্রজেক্টটি করা হচ্ছে, তাহলে ওই ব্যাক্তির EIA জ্ঞান সম্পর্কেই প্রশ্ন জাগবে। কারণ EIA এর কাজই সম্ভাব্য ইমপ্যাক্টসমূহ বিবেচনায় এনে সে অনুযায়ী ঝুঁকি নিরূপণ করে সমাধানের বিষয়ে আলোকপাত করা।

তো স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন এসে যায় যে এত সব ইমপ্যাক্ট আমলে নেওয়ার পরও রামপাল প্রজেক্টে জনস্বাস্থ্য উপেক্ষিত হল কীভাবে? কেউ নিশ্চয়ই বলবেন না যে, “ওই যে ওইসব খারাপ বিষাক্ত জিনিস তৈরি হচ্ছে বলে বলা হচ্ছে, ওইটাই জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি”; কারণ সে ক্ষেত্রে তো বলতেই হবে যে অ্যাবসোলিউট খারাপ জিনিস বলে তো কিছুই নেই।

যে বিদ্যুৎ স্পর্শ করা মাত্র ইলেকট্রিফাইড হয়ে মানুষ ও জীবজন্তু মারা পড়ে, সেই বিদ্যুতের নিরাপদ ব্যবহারই কিন্তু বর্তমানে সারা পৃথিবীর চালিকাশক্তি। ঠিক তেমনি, আপাত নির্দোষ জিনিসও মাত্রাধিক হলে খারাপ আবার আপাত ক্ষতিকর, বিষাক্ত জিনিসও মাত্রার মধ্যে থাকায় ক্ষতির কোনো ভয় থাকে না।

আসুন একটি উদাহরণ দিয়ে এই মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টার উপর আলোকপাত করি।

নিচের টেবিলে স্বাভাবিক ও অ্যাজমাটিক মানুষের উপরে সালফার-ডাই-অক্সাইডের প্রভাব নিয়ে করা একটি এক্সপেরিমেন্টের রেজাল্ট দেওয়া হল। উল্লেখ্য যে, একটি জনগোষ্ঠীর মোটামুটি ৮% সাধারণত অ্যাজমাটিক হয়ে থাকে।

Image-5 (table)

এই টেবিলে দেওয়া এক্সপেরিমেন্টটির রেজাল্টে দেখা যাচ্ছে, বাতাসে ৫৭২ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার মাত্রার সালফার-ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতিতে একজন অ্যাজমাটিক মানুষের অ্যাজমা অ্যাটাক হতে পারে, তাও উচ্চমাত্রার কায়িক পরিশ্রমকালে। আর অন্যদের ক্ষেত্রে অর্থাৎ স্বাভাবিক অবস্থায় স্বাভাবিক মানুষের অ্যাজমা আক্রান্ত হতে আরও বেশি SO2 কনসেনট্রেশন লাগবে যা কিনা ২৮৬০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার বা তার বেশি।

এরপরে নানা সেফটি ফ্যাক্টর প্রয়োগ করে নির্ধারণ করা হল যে, বাতাসে ৮০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার SO2 যদি থাকে তাহলে সেটা সবার জন্য সবসময় নিরাপদ। এই নির্ধারিত মান যে ওই ৮% অ্যাজমাটিক মানুষের জন্যও নিরাপদ তার প্রমাণ হল এই যে এটা তাদের প্রাথমিক সেইফ SO2 কনসেনট্রেশনেরও সাত ভাগের এক ভাগ।

অন্য সব নিরাপদ মানই এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এই অবস্থায় একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ যদি একটি প্রত্যাখ্যাত অতিরঞ্জিত প্রচারণামূলক রিপোর্টের আলোকে ‘ভেইগ’ টার্মে ‘‘এটা খারাপ, ওটা খারাপ’’ বলে ভয় দেখাতে থাকেন তাহলে সাধারণ মানুষ যাবেন কোথায়?

উনারা কোথায় অভয় দেবেন এই বলে যে, পানিতে আর্সেনিক আছে তো কী হয়েছে, এটার মাত্রা ৫০ মাইক্রোগ্রাম/লিটারের কম, এটা কোনো সমস্যা করবে না, নিশ্চিন্তে পান করা যাবে– কোথায় এটা বলে নিজেরাই পান করবেন– তা না করে তারা অন্য কিছু করলে কীভাবে চলবে? সেটাকে কি স্বাভাবিক আচরণ বলা যাবে?

বেশ কিছুদিন আগে একবার পত্রিকায় দেখেছিলাম এক লোকের এইচআইভি পজিটিভ জানাজানি হবার পর গ্রামবাসী তাকে ঘিরে ফেলে পুড়িয়ে মেরে ফেলার জন্য। শুনে স্থানীয় এক ডাক্তার এগিয়ে যান। তিনি ওই রোগীর সঙ্গে কোলাকুলি করেন এবং মাথায় খুনচাপা একদল উচ্চৃঙ্খখল মানুষকে শান্ত করে একজন আসহায় মানুষের জীবন বাঁচান।

আবার এ রকম গল্পও শুনেছি যে চিকেন পক্সের রোগী চেম্বারে আসায় ডাক্তার পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছেন এবং তিনদিন আর চেম্বারমুখো হননি। এই অবস্থা নিশ্চয়ই চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িতদের কাছে কাম্য নয়।

যাহোক বেশি বলা হয়ে যাচ্ছে। রামপালে নির্মিতব্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্যে করা EIA-তে উল্লেখ করা একটা সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যবিষয়ক দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আলোচনা শেষ করতে চাচ্ছি।

যে কোনো কুলিং টাওয়ারের সঙ্গেই এক ধরনের নিউমোনিয়া সংক্রমণের বিরল হলেও সম্ভাবনা থাকে। রামপাল বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের EIA-তে এই সম্ভবনাও কিন্তু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর জন্য পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়াও হয়েছে। দেখুন EIA-র পৃষ্ঠা ২৯১, ৩০৫, ৩২৯, ও ৩৮৬।

তাহলে EIA-তে জনস্বাস্থ্য উপেক্ষিত তা বলা হচ্ছে কীসের ভিত্তিতে? বরং এটা বলা খুবই যুক্তিসঙ্গত যে রামপাল বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের EIA তে স্বাস্থ-সংক্রান্ত সম্ভাব্য সকল বিষয়গুলি বেশ যত্নের সঙ্গেই বিবেচনায় নেওয়া এবং এজন্য পর্যাপ্ত সংশোধনমূলক পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উত্তর ২ এর খ-

আলোচ্য নিবন্ধ “বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি” এর লেখক তার তথ্যসমূহ নিয়েছেন মূলত হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্স (HEAL) নামের একটি পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংগঠনের এমন একটি রিপোর্ট থেকে যারা দুটি কয়লাবিরোধী এনজিওর অর্থে রিপোর্টটি তৈরি করেছে। এই HEAL এর রিপোর্টে যথেচ্ছা অতিরঞ্জন তো আছেই (পড়ে আসছি সে কথায়), পাশাপাশি যোগ হয়েছে নিবন্ধের লেখকের ‘অতি’ অনুবাদ। উদাহরণ দেখুন:

HEAL এর The unpaid health bill: How coal power plants make us sick নামক রিপোর্টে আছে–

A systematic review suggests that cardiovascular mortality rises by 12% to 14% per 10 microgram increase of fine particulate concentrations

নিবন্ধের লেখকের অনুবাদ “গবেষণায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, বাতাসে প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম পার্টিকুলেট পদার্থের পরিমাণ বাড়লে হৃৎপিণ্ডের রোগে মৃত্যুহার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়ে যায়।” মূল পাঠের systematic review suggests লেখকের ভাষায় হয়ে যাচ্ছে “গবেষণায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত”! কী বলব একে? দুটো কি এক জিনিস হল?

এক জিনিস নয়ও আসলে। কেননা একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া যা রেজাল্ট দেয়, ভিন্ন পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া কিন্তু তাই রেজাল্ট দিবে না। পদ্ধতির ভিন্নতায় ফলও বদলে যাবে। কিন্তু যখন বলা হবে, এটা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত– এর অর্থ দাঁড়াবে যে, এর বাইরে অন্যকিছু সম্ভব নয়। লেখক এই ভাষাগত টুইস্টটা কেন করলেন? কোন সৎ উদ্দেশ্যে কি?

নিবন্ধের আরেক স্থানে নিবন্ধের লেখক HEAL-এর ওই রিপোর্টের পৃষ্ঠা ১০ এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, “২০০৯ সালে ইউরোপের ৩০টি দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উদ্ভূত স্বাস্থ্য সমস্যার প্রথম উপাত্ত প্রকাশ করে। সেই তথ্যে দেখা যায়, সেই সময়ের মধ্যে ১৮ হাজার ২০০ টি অকালমৃত্যু হয়েছে।”

প্রথমত, এ তথ্যও ভুল এজন্য ভুল যে HEAL-এর রিপোর্টের পৃষ্ঠা ২৪ বলছে ২৭ টি (৩০ টি নয়) দেশে এই সংখ্যা ১৮,২৪৭ (১৮ হাজার ২০০ নয়) এবং ৩০ টি দেশে তা ২৩,২৮৯। এই ভুলগুলো বাদ দিলেও, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা যেভাবে বলা হয়েছে তাতে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এগুলো তো এস্টিমেট হওয়ার কথা। কারণ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংক্রান্ত উদ্ভূত স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ তো আলাদা কিছু নয় যে দেখলেই বুঝা যাবে এটি নিশ্চিতভাবে কয়লা বিদ্যুৎজনিত মৃত্যু। আর সে ক্ষেত্রে এস্টিমেট এত নির্ভুল হয় কী করে? স্পষ্টতই এই সংখ্যাগুলো হেড কাউন্ট, এস্টিমেট নয়! আশ্চর্যের ব্যাপার নয় কি যে একেবারে হেড কাউন্ট করে কয়লা-দূষণে মৃতের সংখ্যা বলে দেওয়া হচ্ছে?

আসলেই আশ্চর্যের ব্যাপার, কারণ এইখানেই কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। HEAL এর হিসাবটা করা হয়েছে ২০০৬ সালের WHO–এর ডেটার উপর ভিত্তি করে যেখানে বলা ছিল বায়ুদূষণে কয়লার ভুমিকা মাত্র ৫% বা তার চেয়েও কম যা ২০১০ নাগাদ ৫% থেকে আরও ২৭% কমে যাবে। অর্থাৎ ২০১০ এ বায়ুদূষণে কয়লার ভূমিকা দাঁড়াবে এর ৩.৭%-এর কাছাকাছি বা তার চেয়েও কমে।

২০০৯ সালে European Topic Centre on Air and Climate Change একটি টেকনিক্যাল পেপার প্রকাশ করে, যেখানে তারা অ্যাসেস করেন যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (EU) ৪,৯২,০০০ টি অকাল মৃত্যু ঘটতে পারে পার্টিকুলেট ম্যাটার দূষণ থেকে যার মধ্যে হার্ট ও ফুসফুসের সমস্যা এবং ফুসফুসের ক্যানসারই মূলত দায়ী এই অকালমৃত্যুর জন্যে।

http://acm.eionet.europa.eu/docs/ETCACC_TP_2009_1_European_PM2.5_HIA.pdf

WHO এর প্রেডিকশন– ৩.৭% হবে বায়ুদূষণে কয়লার ভূমিকা আর ৪,৯২,০০০ টি অকালমৃত্যু, পার্টিকুলেট ম্যাটার দূষণের কারণে– এই দুইয়ের যোগসূত্রেই কিন্তু ১৮,০০০ সংখ্যাটির উৎপত্তি। এখানে লক্ষ্যণীয় যে HEAL এর দেওয়া যে তথ্য, “১৮,২৪৭ টি শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত মৃত্যু এই ৩.৭% কয়লাসৃষ্ট দূষণের কারণে হচ্ছে”, থেকে কিন্তু এটা কার্যত স্পষ্ট যে HEAL স্বীকার করে নিচ্ছেন, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত টোটাল মৃত্যুর সংখ্যা EU তে হল ৪,৯৩,১৬২ যার মধ্যে মাত্র ১৮,২৪৭ টি মৃত্যু ঘটেছে কয়লা দূষণের কারণে এবং বাকি ৪,৭৪,৯১৫ টি ঘটছে কয়লা ব্যতীত অন্য কোনো দূষণের কারণে।

আর যদি তাই-ই হয় সে ক্ষেত্রে জেনুইন প্রশ্ন উঠে যে, আসলেই কি এখন সময় কয়লা দূষণ নিয়ে মাথা ঘামানোর? নাকি অন্য যেসব দূষণের কারণে এই চার লাখ চুয়াত্তর হাজার নয়শত পনেরো জনের (বাকি ৯৬.৩%) মৃত্যু ঘটল, সেই কারণগুলোর দিকে বেশি খেয়াল করা?

এ কারণেই বলছি, ক্লিন কোল টেকনোলজি আসার পর কয়লাকে সত্যিই বড় কোনো ভিলেন হিসেবে গণ্য করা যায় কি? না কি করা উচিত?

এখানে কিন্তু আবার তাদের পুরো এস্টিমেটের মধ্যে আরও একটু শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। যে হিসাব তারা প্রিম্যাচিওর ডেথ বা অকালমৃত্যু হিসেবে দিয়েছেন, অন্যভাবে দেখলে ওটার একটিও আসলে প্রকৃত মৃত্যু নয়। তাদের মতে, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগজনিত কারণে যে মোট মানবঘণ্টা অপচয় হয়, তার ৩.৭% (২০০৬-এর এস্টিমেট) ১৮,২০০ মানবজীবনের সমতুল্য, তাদের ভাষায় যাকে value of statistical life (VSL) বলা হচ্ছে। আর একেই লেখক অকালমৃত্যু ভেবে কী ভীষণ আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেছেন!

এরপর থেকে যায় আরেকটি ব্যাপার। HEAL যেখানে WHO এর প্রেডিকশন– “২০১০ সাল নাগাদ বায়ুদূষণে কয়লার ভূমিকা হবে মাত্র ৩.৭% শতাংশ” এই তথ্য মেনে নিয়ে নানান ক্যালকুলেশন করে ফেলল, অথচ এটা বলল না যে WHO প্রেডিক্ট করছে ২০২০ সাল নাগাদ এই মাত্রা ৩৭% কমিয়ে ১.৮৫% এ নামিয়ে আনা হবে EU-27 এ। আর এটা শুধুমাত্র উন্নত টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমেই করা হবে।

কয়লার ব্যবহার যে কমানো হবে তা কিন্তু নয়। EuroElectric এর স্ট্যাটিসটিক্স ১৯৮০ সালের তুলনায় ২০০৯ এ SO2 ও NOx এর নিঃসরণ যথাক্রমে ৮০% ও ৫৭% শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে, যেখানে বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়েছে প্রায় ৭৫% এর বেশি। শুধুমাত্র পুরনো যন্ত্রপাতি পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমেই পলিউট্যান্ট নিঃসরণ কমিয়ে আনা যাবে ৯০% আর CO2 ৪০%।

বিস্তারিত দেখুন–

EUROCOAL এর পজিশন পেপারে–

http://www.euracoal.org/componenten/download.php?filedata=1366265206.pdf&filename=EURACOAL%20Position%20Paper_20130408%20HEAL.pdf&mimetype=application/pdf

EURACOAL এর পজিশন পেপার পেয়ে এবং কাঙ্ক্ষিত প্রচার না পেয়ে HEAL-এর মায়াকান্নাটি আছে এখানে–

http://www.env-health.org/IMG/pdf/heal_response_to_euracoal_statement.pdf

এটাকে মায়াকান্না ছাড়া কিছু বলা যাচ্ছে না এ কারণে যে এতে HEAL কয়েকবার স্বীকার করেছে যে আসলেই কয়লার কারণে বায়ুদূষণ মাত্র ৩-৪ শতাংশ; তারপরও ‘‘… কিন্তু… তবু… যদি… ইত্যাদি …… অনেক কিছু…’’ ইত্যাদি বুঝিয়েছে তারা। এখানে HEAL অতি মোলায়েম কণ্ঠে এই অনুরোধও করেছেন যে তাদের সব অভিযোগ জানালা দিয়ে ছুঁড়ে না ফেলে একটু কনসট্রাকটিভ ক্রিটিসিজম করলেই তো হয়; যদিও HEAL তাদের রিপোর্টের ব্যাপারে EUROCOAL এর Scientific Credibility নিয়ে তোলা অভিযোগের কোনো সদুত্তর এনে হাজির করতে পারেনি।

HEAL তাদের মায়াকান্না বক্তব্যে অতীব বিনয়ের সুরে এটাও বলেছে যে তাদের এইসব ‘আশংকা’ যদি EUROCOAL আমলে না নেয় তাহলে EUROCOAL কিন্তু ‘একই ভুল’ আবার করবে এবং তাই EUROCOAL এর উচিত HEAL এর দাবি আমলে নেওয়া। কিন্তু অলরেডি প্রযুক্তিগত উন্নতি সাধনের মাধ্যমে যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রজনিত দূষণের মাত্রা ২০২০ সাল নাগাদ আরও ৩৭% কমিয়ে মাত্র ১.৮৭% এ নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা HEAL বলার আগেই EUROCOAL নির্ধারণ করে রেখেছে সেটা HEAL এর মায়াজড়ানো দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে আশ্চর্যজনকভাবে!

আর যেখানে HEAL দাবি করার আগেই পুরো ব্যাপারটি আমলে নেওয়া হয়ে গেছে, সেখানে HEAL এর মূল রিপোর্টটি আর কী গুরুত্ব বহন করে এবং সে ক্ষেত্রে এই রিপোর্টকে আর আমলে না নেওয়াটাই কি স্বাভাবিক নয়?

তো যাই হোক, সারকথা হল এ রকম HEAL এর The unpaid health bill: How coal power plants make us sick নামের রিপোর্টটিতে আরও অনেক তথ্যই আছে যা ২০০০ সালের ডেটার উপর ভিত্তি করে ও প্রজেকশন দিয়ে ২০০৬ সালে WHO প্রকাশ করেছিল। সেই ২০০০ সালের ডেটাকে HEAL ২০০৯ এ ব্যবহার করেছে তাদের ‘আশংকার’ মূল কারণ হিসেবে। এদিকে যে সেসব আশংকার অনেকটাই পূরণ হয়ে গেছে আর বাকিটা প্রায় পূরণের পথে, সেটা আবার মাথায় ঢোকেনি তাদের।

আর এসব পুরনো তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা HEAL এর রিপোর্টটি আবার ‘বিদ্যুৎ প্রকল্প: রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি’ নিবন্ধের লেখক ব্যবহার করেছেন ২০১৩ সালের প্রেক্ষাপটে অত্যাধুনিক টেকনোলজিতে নির্মিতব্য রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দূষণ সংক্রান্ত ঝুঁকি অ্যাড্রেস করতে!

এখানে তাই পুরো ব্যাপারটিকে “প্রোপাগাণ্ডানির্ভর NGO-র বস্তাপচা ডেটা সম্বলিত” লেখা ছাড়া কী-ই-বা বলা যায়?

প্রশ্ন ৩-

রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নিঃসরিত CO2 এর হয়তো এসিড রেইনের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, কিন্তু CO2 তো গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্যে দায়ী। কেন কার্বন ক্যাপচার মেকানিজমের মাধ্যমে CO2 এর নিঃসরণ কমানো হচ্ছে না? এ ক্ষেত্রে গ্লোবাল পার্সপেকটিভ থেকে কি আমরা ‘ই-রেসপনসিবল’ আচরণ করছি না?

উত্তর ৩-

অভিযোগটি গুরুতর। তাই গুরুত্বের তিনটি ধাপে সঙ্গেই উত্তরটি দিতে চেষ্টা করব–

ক) রামপালের বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি থেকে যে পরিমাণ CO2 উৎপন্ন হবে তা আসলে বিশ্বের পার্সপেকটিভে কতটুকু;

খ) কার্বন ক্যাপচার মেকানিজমটি আসলে কী;

গ) রামপালে কি আসলেই কোনো রেসপনসিবল ব্যবস্থা নেওয়া হবে না CO2 এর জন্যে?

ক) এ কথা পুরোপুরি ঠিক যে বিশ্বের কোথাও কোথাও কার্বন ক্যাপচার টেকনোলজি ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং কমানোর জন্যে CO2 নিঃসরণে রেশনিং-এর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যে সব দেশ তাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে বাধ্য হচ্ছে তারা তাদের বিভিন্ন খাতে উৎপন্ন CO2 কে উচ্চ চাপে কমপ্রেস করে সাধারণত পাইপলাইনের মাধ্যমে (বা ট্রেন, ট্রাক বা জাহাজযোগে) পরিত্যক্ত কয়লা বা তেল খনিতে ইনজেক্ট করে কার্বন রেশনিং মাত্রা বজায় রাখার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা করছে।

এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, কারণ কমপ্রেসড CO2 এর পরিবহণ খরচই যে শুধু বিবেচ্য তা নয়, ভূগর্ভস্থ যে স্তরে তা ইনজেক্ট করতে হবে তা প্রায় সাত হাজার ফুট নিচে অবস্থিত। তার উপর পরিত্যক্ত খনি না থাকলে সেই স্তরে পৌঁছানোও বিশাল শ্রমসাধ্য ব্যাপার।

নিচে ছবিতে দেখুন যে মাটির প্রায় সাড়ে ছ’ হাজার ফুট নিচে যে ইমপার্মিয়েবল সিল আছে তা ভেদ করে তবেই কেবল কমপ্রেসড CO2 ইনজেক্ট করা যায়। তা না হলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরসহ অন্যান্য স্তরে দূষণ ও ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাই কার্বন ক্যাপচার টেকনিকটি সেই সব দেশই অ্যাপ্ল্যাই করার কথা চিন্তা করছে যাদের এছাড়া জরিমানা গুনতে হবে।

Image-6 ( carbon capture)

কার্বন ক্যাপচার সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন এখানে–

http://www.epa.gov/climatechange/ccs/

খ) উপরের তিন নম্বর চিত্রে ইউএসএ-এর বিদ্যুৎ খাত থেকে বাৎসরিক ভিত্তিতে উৎপন্ন CO2 এর পরিমাণ দেখানো হয়েছে। তা থেকে দেখা যায় যে ইউএসএ-তে ২০১১ সালে বিদ্যুৎ খাত থেকে নিঃসরিত CO2 এর পরিমাণ ২,২৪,৭০,৭১,০০০ মেট্রিক টন। রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বছরে উৎপন্ন হবে মাত্র ৭৯,০০,০০০ মেট্রিক টন CO2। দেখা যাচ্ছে রামপাল থেকে নিঃসরিত CO2 এর পরিমাণ ইউএসএ-এর বিদ্যুৎ খাত থেকে নিঃসরিত CO2 এর তুলনায় একেবারেই নগণ্য, মাত্র ০.৩৫% শতাংশ।

শুধু তাই-ই নয়, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বিভিন্ন খাত থেকে যে পরিমাণ CO2 নিঃসরণ হয় তার মধ্যে সবচাইতে বেশি CO2 নিঃসরণ করে চীন (প্রায় ২৩%)। এরপর আছে ক্রমানুসারে ইউএসএ (প্রায় ১৮%), ভারত (প্রায় ৬%), রাশিয়া (প্রায় ৫.৫%), জাপান (প্রায় ৪.%), জার্মানি (প্রায় ২.৭%)। এই তালিকাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৩ তম (প্রায় ০.১৬%)।

CO2 এর এই নিঃসরণ পার ক্যাপিটা হিসাব করলে অর্থাৎ প্রতি জন মানুষে কত টন CO2 নিঃসরণ হয়, সেই হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬০ এ। বাংলাদেশ সারা বছরে যে পরিমাণ CO2 নিঃসরণ করে তা হল প্রতিজন বাংলাদেশির জন্যে মাত্র ০.৪ মেট্রিক টন। এই তালিকায় সবচেয়ে উপরে আছে কাতার (৪০ টন/প্রতি একজনে), দশ নম্বরে ইউএসএ (১৭.৬ মেট্রিক টন/প্রতি জনে), ৩৫ নম্বরে জার্মানি (৯.১ মেট্রিক টন/প্রতি একজনে), ১১৮ নম্বরে ভারত (১.৭ মেট্রিক টন/প্রতি একজনে)।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ডাটা ২০১০–

http://data.worldbank.org/indicator/EN.ATM.CO2E.PC/countries/1W?display=default

এত কিছুর পরও কিন্তু ইউএসএ, জার্মানির মতো উচ্চ CO2 নিঃসরণ হয় যেসব দেশে, সেগুলোতেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে CO2 নিঃসরণ কমাতে কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজ (CCS) টেকনোলজির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়নি।

দেখুন ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ এর খবর–


http://www.reuters.com/article/2013/09/23/us-usa-coal-epa-idUSBRE98M0Y620130923

অগাস্ট ৭, ২০০১৩ এর খবর–

ht