বুধবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ || সময়- ৩:১২ pm
আগাছামুক্ত ক্ষেতে থাকবে না গমের ব্লাস্ট রোগ

ইনফরমেশন ওয়াল্ড কৃষি নিউজ ডেক্স
চট্টগ্রাম:-----: গমের ছত্রাকজনিত ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সারা দেশে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। দেশজুড়ে গম ক্ষেত মনিটর করার পাশাপাশি এ রোগের প্রতিকারে প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
 অধিদফতর জানায়, বীজ শোধন করে বপন এবং জমিকে আগাছামুক্ত রাখলে ব্লাস্ট রোগ থেকে রক্ষা পাবে কৃষকের গমের ক্ষেত।
গত মৌসুমে যশোর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল ও ভোলা জেলায় গমের ক্ষেতে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ হয়।
গমের বীজ বপনের এই সময়ে কৃষকদের নানা পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।
অধিদফতরের বালাইনাশক প্রশাসন ও মান নিয়ন্ত্রণ উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এ জেড এম ছাব্বির ইবনে জাহান বাংলানিউজকে বলেন, ‘ওই সাত জেলাসহ এবার সারা দেশে গমের ক্ষেত মনিটর করছি। যেসব এলাকায় গমের চাষ হয়, সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে’।
কৃষিবিদ ছাব্বির ইবনে জাহান বলেন, গমের ব্লাস্ট একটি ক্ষতিকর ছত্রাক জনিত রোগ। গমের শীষ বের হওয়া থেকে ফুল ফোটার সময়ে তুলনামূলক গরম ও স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া থাকলে এ রোগের আক্রমণ ঘটতে পারে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, ব্লাস্ট রোগ ১৯৮৫ সালে সর্বপ্রথম ব্রাজিলে দেখা দেয়। পরবর্তীতে ব্রাজিলসহ দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনায় বিস্তার ঘটে।
অধিদফতরের প্ল্যান্ট প্রটেকশন উইংয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর মো. রেজাউল ইসলাম বাংলানিউজকে জানান, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে সাত জেলার প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে এ রোগের আক্রমণ দেখা যায়। যা গম আবাদি জমির প্রায় ৩ শতাংশ।
অধিদফতর জানায়, আক্রান্ত গম ক্ষেতের ফলন ২৫-৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে এ রোগের কারণে ক্ষেতের সম্পূর্ণ ফসল বিনষ্ট হতে পারে। সেজন্য আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে অধিদফতর।
রেজাউল ইসলাম বলেন, গমের শীষ যখন বের হয়, তখন এ রোগ আক্রমণ করে। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে দ্রত ছড়ায় এ রোগ। বীজ বপনের সময় থেকে ফসল ওঠা পর্যন্ত মনিটর করে ধাপে ধাপে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ রোগ থেকে মুক্তি মিলবে।
ওইসব জেলায় গমের বীজ ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আক্রমণ দেখা দিলে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেগুলো জানিয়ে লিফলেট ও ফ্যাক্টশিট বিতরণ করা হচ্ছে।
চেনার উপায়
গম ক্ষেতের ব্লাস্ট আক্রান্ত স্থানে শীষ সাদা হয়ে যায় এবং অনুকূল আবহাওয়ায় তা অতি দ্রুত সারা ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রধানত গমের শীষে ছত্রাকের আক্রমণ হয়। শীষের আক্রান্ত স্থানে কালো দাগ পড়ে ও আক্রান্ত স্থানের ওপরের অংশ সাদা হয়ে যায়। তবে শীষের গোড়ায় আক্রমণ হলে পুরো শীষ শুকিয়ে সাদা হয়ে যায়। আক্রান্ত শীষের দানা অপুষ্ট হয় ও কুঁচকে যায়, দানা ধূসর বর্ণের হয়ে যায়।
পাতায়ও এ রোগের আক্রমণ হতে পারে। এক্ষেত্রে পাতায় চোখের মতো ধূসর বর্ণের ছোট ছোট দাগ পড়ে।
বিস্তার ঘটে যেভাবে
আক্রান্ত বীজের মাধ্যমে গমের ব্লাস্ট রোগ ছড়ায়। বৃষ্টির কারণে গমের শীষ ১২-১৪ ঘণ্টা ভেজা থাকলে এবং তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা এর বেশি হলে এ রোগের সংক্রমণ হয় এবং রোগের জীবাণু দ্রুত বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ব্লাস্ট রোগের জীবাণু চাপড়া, শ্যামা, আঙগুলিসহ ঘাস জাতীয় কিছু কিছু পোষক আগাছার মধ্যে বাস করতে পারে। তবে সেখানে রোগের লক্ষণ সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না।
নিয়ন্ত্রণের উপায়
কোনো অবস্থাতেই আক্রান্ত জমি থেকে বীজ সংগ্রহ করা যাবে না। অপেক্ষাকৃত কম সংবেদনশীল জাত যেমন- বারি ২৮ ও বারি ৩০ জাতের গম চাষ করতে হবে। উপযুক্ত সময়ে (১-১৫ অগ্রহায়ণ) বীজ বপন করতে হবে, যেন শীষ বের হওয়ার সময়ে বৃষ্টি ও উচ্চ তাপমাত্রা পরিহার করা যায়।
বপনের আগে প্রতি কেজি বীজের সঙ্গে ৩ গ্রাম প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউ পি অথবা ৩ মিলি হারে ভিটাফ্লো ২০০ এফএম ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে। বীজ শোধন করলে গমের অন্যান্য বীজবাহিত রোগও দমন হবে এবং ফলন বৃদ্ধি পাবে। গমের ক্ষেত ও আইল আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে শীষ বের হওয়ার সময়ে একবার আর ১২-১৫ দিন পর আরেকবার প্রতি শতাংশ জমিতে ৬ গ্রাম নাটিভো ৭৫ ডব্লিউ জি অথবা নভিটা ৭৫ ডব্লিউ জি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করলে গমের পাতা ঝলসানো রোগ, বীজের কালো দাগ রোগ এবং মরিচা রোগ দমন হবে।
সতর্কতা
ছত্রাকনাশক ব্যবহারের সময় হাতে রাবার অথবা প্লাস্টিকের গ্লোবস্‌ এবং মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। যেন রাসায়নিক দ্রব্য শরীরের সংস্পর্শে না আসে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে না পারে।
এ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, গম গবেষণা কেন্দ্র, কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, সামিট কার্যালয়, ডিলার পয়েন্টে যোগাযোগ করা যেতে পারে বলেও জানায় অধিদফতর।
জরুরি ফোন নম্বর: গম গবেষণা কেন্দ্র, দিনাজপুর (০৫৩১-৬৩৩৪২), আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, যশোর (০৪২১-৬৮৬৪৯, ৬১০৫৯), আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বরিশাল (০৪৩২৭-৭৩৩৬১) এবং সামিট, ঢাকা (০২৯৮৯৬৬৭৬)।
তথ্য সূত্র :-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম