শনিবার ১৮ নভেম্বর ২০১৭ || সময়- ৩:১৭ pm
ক্ষয়ে পড়ছে রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন মন্দির

ইনফরমেশন ওয়াল্ড বেড়ানো নিউজ ডেক্স
চট্টগ্রাম:----মোটরভ্যানের চালক বাহন থামিয়ে এক বৃদ্ধ পথিকের কাছে নবরত্ন মন্দিরের ঠিকানা জানতে চাইলেন। জবাবে সেই বৃদ্ধ লোক বললেন, ‘সে তো অনেক দূর, এই রাস্তা ধরে মোস্তফাপুর, কিন্তু সেখানে কই যাবেন, কার কাছে যাবেন? নবরত্ন মন্দিরে তো কেউ নাই, ঘেরের মাঝখানে খালি একটা ভাঙা মন্দির’।
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের পাউখালী থেকে রওয়ানা দিয়ে পাকা-আধপাকা আর কাঁচা সড়ক পেরিয়ে ধলবাড়িয়া ইউনিয়নের মোস্তফাপুর গ্রাম। গড়ের হাঁট, সেকেন্দর নগর চৌমুহনী বাজার ও গোবিন্দপুর বাজার পেছনে ফেলে ভ্যান থামলো কালিন্দা নদীর চর যাওয়ার আগে মাছের ঘেরের মাঝ দিয়ে যাওয়া কাঁচা রাস্তাটায়। গোবিন্দপুর বাজার থেকে ধলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের দিকে যাওয়ার রাস্তা বাঁয়ে ফেলে এই রাস্তায় নামার আগেই একজন দেখিয়ে দেন নবরত্ন মন্দির।
এখানে নেমেই হাতের বাঁয়ে চোখে পড়লো মাছের ঘেরগুলোর মাঝখানে দূরে মন্দিরটা। জুমার দিন ভরদুপুর বলে হোক, অজপাড়া গাঁ বলে হোক, এলাকাটা একেবারে নীরব মনে হলো। ঘেরের আলপথ ধরে ১০ মিনিট হেঁটে একেবারে মন্দিরের সামনে পা পড়লো।
ক্ষয়ে যাচ্ছে রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন মন্দিরকাঠামোই বলে দেয় অনেক প্রাচীন মন্দির। বর্গাকার এ মন্দিরে ইটের গাঁথুনিতে কোনো প্রলেপ চোখে পড়লো না। ওপর থেকে নিচের অংশ, উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম, চারপাশ থেকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ে যাচ্ছে ইট। ইট ক্ষয়ে কাঠামো হারিয়েছে দক্ষিণ পশ্চিম ও পূর্ব দিকের ধনুকাকৃতির অর্ধ বৃত্তাকারের দু’টি প্রবেশপথও।
মন্দিরের ওপরে কয়েকটা মরাগাছ। চারপাশেও গজিয়েছে গুল্ম-লতা, কিছু গুল্ম-লতা মরেও গেছে। উত্তর-পশ্চিম কোণে খসে পড়া ইটের স্তূপ। আশপাশে গজিয়ে উঠেছে একটা খেজুর, কয়েকটা বাবলা ও নিম গাছ।  মন্দিরের সামনে ইট-ইটের খণ্ডের ওপর পড়ে আছে ঘেরে মাছ ধরার ৮-১০টা ঘোনা।
ক্ষয়ে যাচ্ছে রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন মন্দিরএতোক্ষণে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন পাশের জগদ্ধানন্দ পুরের বাচ্চু মিয়া ও আবদুস সবুর। দূরের একটি ঘেরে মাছ ধরে ফিরছিলেন। তারা জানালেন, এই মন্দির  কয়েকশ’ বছর আগে থেকে এখানে দেখা যাচ্ছে বলে বয়স্কদের কাছে শুনেছেন তারা। কেবল বলতে পারলেন, মন্দিরটিতে প্রতিবছর সনাতন সম্প্রদায়ের মনসা পূজা পালন হয়। নানা অঞ্চল থেকে অনেকে এ পূজা মণ্ডপে পূজা অর্চনা করতে আসেন।
তাদের সঙ্গে আলাপেকালেই পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন কালিন্দা নদীর চরের বাসিন্দা খোদেজা বেগম। তিনি জানান, অনেক অনেক আগে মন্দিরটা একদিন গায়েবিভাবে উঠেছে বলে শুনেছেন তারা। তারপর থেকে এখানে মনসার পূজা হয়। পূজার আগে পরে খানিক দেখভাল করা হলেও সারাবছর মন্দির এভাবেই থেকে যায়।
ক্ষয়ে যাচ্ছে রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন মন্দিরস্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী এই মন্দির মুঘল আমলের অর্থাৎ ষোল শতক থেকে আঠার শতকের কোনো একসময় তৈরি। এই কথার পক্ষে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন, মন্দিরটি ষোড়শ’ শতকের যশোরের মহারাজা বিক্রমাদিত্য বা তার পুত্র রাজা প্রতাপাদিত্য বানিয়েছেন। নবরত্ন মন্দির নামকরণের পেছনে যে প্রচলিত কাহিনী, তাও বিক্রমাদিত্যের নির্মাণের পক্ষে।
বলা হয়ে থাকে, মুঘল সম্রাট আকবর যেমন নয়জন সভাসদ নিয়ে নিয়মিত শলা-পরামর্শ করতেন, রাজ্য পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন, তেমনি রাজা বিক্রমাদিত্যও তার রাজ্যের নয় গুণীকে নিয়ে একটি পর্ষদ গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একত্র হতেন। তখন ওই নয় জনকে নিয়ে এই মন্দিরে বসতেন বলে এটির নাম নবরত্ন (নয় রত্ন) মন্দির হয়েছে। এমনকি এ মন্দির নিয়ে যে সরকারি নথি আছে, সেখানেও এটিকে কোনো ধর্মীয় মন্দির বলা হয়নি।
ক্ষয়ে যাচ্ছে রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন মন্দিরকিন্তু ক্ষুদ্র এ মন্দিরের কাঠামো-প্রকৃতি দেখলে আবার এই অনুমানভিত্তিক মতকে সত্য ধরে নেওয়া যায় না। এটির আদল ধর্মীয় মন্দিরই উঠে আসে বিভিন্ন বর্ণনায়।
বাইরের দিকে ১০.২ মিটার বাই ১০.২ মিটার আয়তনের এবং ১৪.৩২ মিটার উচ্চতার (মাটি থেকে মাঝখানের বড় গম্বুজের চূড়া) এ মন্দিরের অবস্থান একটি সুদৃঢ় বুহ্যের মধ্যে। এখন অনেক কিছুই ধ্বংস হয়ে গেলেও মূল কাঠামোতে মন্দিরটি একেবারে মধ্যস্থলে ছিল এবং এর চারপাশে ছিল আরও চারটি কক্ষ। চারপাশে ছিল বারান্দাও। মূল বড় গম্বুজের পাশাপাশি এই চার বারান্দার ওপরও চারটি গম্বুজ ছিল। মোট এ পাঁচটি গম্বুজের ওপর পাঁচটি চূড়া ছাড়াও সবচেয়ে বড় চূড়াটার চার কোণে ছিল আরও ৪টি চূড়া। এভাবে ছিল মোট ৯টি চূড়া।
ক্ষয়ে যাচ্ছে রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন মন্দির এছাড়া এখন কেবল খসে পড়তে থাকা ইট আর মরা গাছ ছাড়া কিছু চোখে না পড়লেও কিছু বছর আগেও মন্দিরের গর্ভগৃহের দেওয়ালে প্রতাপ আমলের চিত্রশিল্পের নিদর্শন ছিল। ভাঙাচোরা কাঠামোর মধ্যেও দেওয়ালে বোঝা যেত রাধাকৃষ্ণের মূর্তি, ধনুকধারী বীর, অশ্বারোহী বাহিনীর যুদ্ধযাত্রা, নানা রকমের ফুল, গরুড় মূর্তি, দশ অবতার রামায়ণ, মহাভারতের নানা কাহিনীসহ অনেক ছবি বা চিত্রলিপি। এসব চিত্র-লিপি নির্মাতাদের বৈষ্ণবভক্তির পরিচয় দেয়। জানা যায়, বিক্রমাদিত্যও ছিলেন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের। সে হিসেবে এটি যে তিনি বানিয়েছেন, এই যুক্তিই পোক্ত হয়।
যদিও মন্দিরের দেওয়াল থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া একটি শ্লোকের ব্যাখ্যায় বোঝা যায়, মন্দিরটির নির্মাতা হিসেবে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের নাম ছিল। অবশ্য, শ্রীকৃষ্ণ যে নিজে এসে এ মন্দির নির্মাণ করে যাননি তা বলা যায়।
ক্ষয়ে যাচ্ছে রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন মন্দিরঅজপাড়া এই গাঁয়ে অনেক কল্পকথা-কাহিনীর ঐতিহাসিক নবরত্ন মন্দির যে অযত্ন আর অবহেলায় আছে তা ঠিকানা চাইতেই তো সেই বৃদ্ধ লোক বুঝিয়ে দিলেন। এখন এটিকে পুরাকীর্তি ঘোষণা করে হোক বা সংস্কার করে হোক, রক্ষণাবেক্ষণ যে করতে হবে, সে দায়িত্বটা কে এগিয়ে এসে নেবে?
যেভাবে যাবেন
সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার পাউখালী নেমে মোটরসাইকেল অথবা মোটরচালিত ভ্যান ভাড়া করে ধলবাড়িয়ার মোস্তফাপুর গ্রামে গেলেই ঘেরের মাঝখানে নীরব দাঁড়িয়ে নবরত্ন মন্দির।
তথ্য সূত্র :-বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম